মানুষের মনে প্রকৃতির ঐক্য তৈরি করা

5 (2)

ড. বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর

শিল্পীর স্বাভাবিক প্রতিবেশ হচ্ছে বাস্তব। বাস্তবকে সবসময় খুঁজতে হয়, কামরুল হাসানের কাজে এই খোঁজার শেষ নেই। বাস্তবের উলটো কাল্পনিকতা নয়, বরং বাস্তব থেকে কাল্পনিকতা তৈরি হয়। কামরুল হাসান, তাঁর কাজে, এই বিরোধ ভুল বলে ভেবেছেন। ঘটনা হচ্ছে বাস্তব মুষ্টিবদ্ধ করার এক উপায়, বাস্তব ঘটনা থেকেই তিনি কাল্পনিকতা নির্মাণ করেছেন। শিল্পী মাত্র, কামরুল হাসান সুদ্ধ, সবাই উদ্ভাবন করেছেন বাস্তবের কাছে পৌঁছতে। এক্ষেত্রে, কেবল এক্ষেত্রে, বাঁধাবুলি ভেঙে অগ্রসর হতে হয়। কামরুল হাসান বাঁধাবুলি ভেঙে অগ্রসর হয়েছেন।

বাস্তব ও শিল্পী ও শিল্পকাজের মধ্যে একটা পর্দা আছে। এই পর্দা সম্বন্ধে তিনি সচেতন। তাঁর সারাজীবন বাস্তবের জন্যে ক্লান্তিহীন এক অন্বেষা। রং, আকাশ, বাতাস ও ঘরবাড়ি মিলিয়ে কাজের যে-জলবায়ু, এসবই তাঁর দিক থেকে সামনে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশনা। বাস্তবতা সামনেই। এই আরতি গভীর ও নিবিড় হয়েছে যখন তিনি আক্রান্ত হয়েছেন ব্যক্তিগত সংকটে, যখন তিনি ভেবেছেন তাঁর পক্ষে বাস্তব উদ্ধার করা সম্ভব নয়। এই সংকট তাঁকে গ্রাস করেছে। সংকটের মধ্যে তিনি পথ হাতড়েছেন এবং নীরবে অগ্রসর হয়েছেন। তাঁর নীরব অগ্রগতির ডিভাইসিভ পয়েন্টগুলি তাঁর অসংখ্য আখ্যান কিংবা পোর্ট্রেট। এই পয়েন্টগুলিতে মুখর তাঁর চিন্তা ও অনুভূতি, চারপাশে স্তব্ধতা। প্রত্যেকদিন ঘুম থেকে উঠে মনে হয়, আজকের দিনটা জীবনের প্রথম দিন। এই বোধ থেকে তাঁর কাজ দেখতে শেখা।

Quamrul Hassan Untitled Pen & Ink on paper, 4 inch by 5 inch (2)

তাঁর কাছে সবচেয়ে বড়ো ধ্যান তাঁর কাজ। বাস্তবের মধ্যে তিনি শ্রম দেখেছেন এবং তাঁর অনুক্ষণ সঙ্গী কাজের মধ্যে শ্রম দেখেছেন। এই শ্রম বাঁচার জন্য আবশ্যিক। আবার শ্রমের মধ্যে ইনজাস্টিস দেখেছেন, মনুষ্যত্বের অপরপিঠ, যেন ইতিহাসের প্রথম থেকেই। তাঁর বিশ্বাস বাস্তব ধরা যায়, বোঝা যায়, আয়ত্ত করা যায় কাজের মধ্যে দিয়ে, কারণ বাস্তব হচ্ছে শেষ পর্যন্ত, উৎপাদনের একটি ধরন। তাঁর কাজ, অজস্র কাজ, অপরিমিত কাজ এ-কথাই বলে। তাঁর জলরং, তাঁর প্যাস্টেল, তাঁর চারকোল ড্রইংয়ে তিনি স্বতঃস্ফূর্ত। তিনি মহিলাদের দুধরনের মুখ, দুধরনের পোর্ট্রেট এঁকেছেন। প্রথম ধরনের মুখ হচ্ছে ভালোবাসার মুখ, বিষন্ন কিংবা দ্বিধাগ্রস্ত। অন্য ধরনের মুখ হচ্ছে কিউবিস্ট নির্মাণ। কামরুল হাসানের কাজে একটা প্রত্যক্ষতা আছে, তাঁর কাজে উচ্চকিত কব্জির জোর। তাঁর বাস্তবের মহিলা এবং কল্পনার প্রেমিকার মধ্যে তিনি গেঁথে দিয়েছেন এক ধরনের প্রেমপত্র। এই প্রেমপত্র অভিজ্ঞতা থেকে নিঃসৃত, তাঁর স্মৃতিতে উজ্জ্বল। ঘুমহীন রাত্রে তাঁকে তাড়া করে ফিরে, তখন তিনি ফিরে যান তাঁর কাজে। এই বাস্তবতা উঁচু ও নিচু স্টাইলের ব্যালান্স চূর্ণচূর্ণ করেছে, যেমন কিনা জয়নুলের ও কামরুলের হস্তক্ষেপ ধ্বংস করেছে সাব¬লাইম এবং প্রাত্যহিক জীবনের বিচ্ছিন্নতা। তার ফলে একটি নতুন শিল্পরীতির প্যাক্টের অন্বেষণ শুরু হয়েছে শিল্পী ও দর্শকের মধ্যে, একটি নতুন সমন্বয়ের সূত্রপাত ঘটেছে স্টাইল ও ব্যাখ্যানের মধ্যে। এসব সম্ভব হয়েছে জয়নুল ও কামরুলের ঐতিহাসিক উপস্থিতির জন্য।

তাঁর স্টাইল? তাঁর স্টাইল চটুল। একটা অ্যাকশন কিংবা রিঅ্যাকশনের বোধ তাঁর কাজে ছড়ানো। সেইসঙ্গে একটা এলিগ্যান্সের ধরন স্পষ্ট। আমার বক্তব্য: সবকিছু সত্ত্বেও, একটা মেলোডির খোঁজ মেলে তাঁর কাজে। স্টাইল তাঁর কাজের ভেতর থেকে উঠে এসেছে এবং স্টাইল সংগীতের খুব ঘনিষ্ঠ। কামরুল হাসান স্টাইলের কতকটা ধার করেছেন জয়নুল থেকে, কতকটা করেছেন বৈপ্লবিক ভবিষ্যৎ থেকে।

বৈপ্লবিক ভবিষ্যৎ তৈরি হয়েছে তাঁর বিশ্বাস থেকে। তিনি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী ছিলেন। এই জাতীয়তাবাদ হচ্ছে সাধারণ মানুষের গহীনে একটি অধ্যাত্মবাদী আন্দোলন, সমসাময়িক জীবনের ঘটনার ভেতর থেকে তার জন্ম। তিনি দেখেছেন একটি নতুন হৃদয়ের উদ্ভাবন, একটি নতুন প্যাশনের জাগরণ। তিনি দেখেছেন একটি সম্পূর্ণ বাস্তব, অন্যদিকে এই বাস্তব সবকিছুর ভিত্তিমূল কেন্দ্র বদলে দিয়েছে, আমাদের চোখের সামনে তাঁর জন্মান্তর ঘটেছে। কিন্তু তাঁর কাজের বিষয় রাজনৈতিক নয় কিংবা রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে তিনি কম ছবি এঁকেছেন। তাঁর কাজের প্রধান বিষয় নারী, নারীদেহ, পশুপাখি, নিসর্গ। আমরা তাঁর নারী শরীরের কাঁধ, বুক, উরুর দিকে তাকাই আর তাঁর নারীদেহের নমনীয়তা, বক্রতা এবং উষ্ণতা আমাদের ঘিরে ধরে। যে আবেগ নিয়ে তিনি নারীদের এবং তাদের শরীর এঁকেছেন, সেই একই আবেগ নিয়ে তিনি এঁকেছেন পশুপাখি এবং তাদের ভেতর দিয়ে আবিষ্কার করেছেন নিসর্গ। এই দুই বিষয় তিনি বারবার এঁকেছেন। নারীদের তিনি ভালোবেসেছেন সত্য, কিন্তু নারীদের অধস্তন অবস্থান মানুষী মর্যাদাবোধের বিপরীত, এটা তিনি মেনে নিতে পারেননি। নারী শরীরের বিস্ফোরণে তিনি সমাজটা নাড়িয়ে দিতে চেয়েছেন। অন্যপক্ষে পশুপাখি এঁকে তিনি রোমান্টিকতা প্রকাশ করেননি। কিংবা গ্রামকে সেন্টিমেন্টালাইজ করেননি। শহর ও শহরতলির দারিদ্র্য এবং বাজারসৃষ্ট কলোনির শিল্পায়ন তাঁকে ক্রুদ্ধ করেছে, সেজন্যে তিনি নিসর্গে ফিরে গেছেন, পশুপাখি মানুষ-মানুষীর আনন্দে উন্মীল নিসর্গে হয়তো আছে জবাব কুশ্র্রিতা- কদর্যতার। এখান থেকে মানুষ ফের যাত্রা শুরু করে ইতিহাসের যে-বোধ সে হারিয়েছে কলোনিকালে, সেই বোধকে সে উদ্ধার করবে। এ-ধরনের একটা ধারণা কামরুল হাসানের মধ্যে কাজ করেছে।

3 (2)

আর একটা বোধ তাঁর মধ্যে কাজ করেছে। তিনি জাতীয়তাবাদের সরল দিক যেমন বিশ্বাস করেছেন, তেমনি জীবনের সরল দিকের মধ্যে মুক্তির সম্ভাবনায় বিশ্বাস করেছেন। সেজন্য তাঁর বিষয়ের ক্ষেত্রে জটিলতা নেই। অর্জিত ঐতিহ্য তিনি প্রসারিত করেছেন নানা দিকে। তিনি ড্রইং থেকে কাজ করেছেন আস্তে আস্তে, প্রায়শই তিনি ফিরে যেতেন একই মোটিফে। একপক্ষে নারী, অন্যপক্ষে পশুপাখি গ্রামীণ জীবন কাজের প্রধান বিষয় হিসেবে বাছাই করার মধ্যে দিয়ে তিনি এ-দুটি বিষয়ের ক্ষেত্রে মর্যাদা ও স্থায়িত্ব লগ্নি করেছেন।

কামরুল হাসানের কল্পনা বিদ্যমান সমাজফর্ম অতিক্রম করেছে। এই অতিক্রমণের মধ্যে তাঁর কাজগুলো ব্যক্তিক নিঃসঙ্গতা কেবল নয়, ইতিহাসের নিঃসঙ্গতার মধ্যে চাকা খুঁজে পেয়েছে। মার্কস (১৯৩২) সেজন্যই লিখেছেন:

‘The human essence of nature first exists only for social man; for only here does nature exist as the foundation of his own human existence. Only here has what is to him his natural existence become his human existence, and nature become man for him. Thus, society is the unity of being of man with nature – the true resurrection of nature – the naturalism of man and humanism of nature both brought to fulfillment.’

কামরুল হাসান এদিকেই অগ্রসর হয়েছেন – প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের ঐক্য তৈরির দিকে।

References: Marx, K. (1932). Economic and Philosophic Manuscripts of 1844. Moscow: Progress Publishers
[ড. বোরহান উদ্দিন খান জাহাঙ্গীর (১৯৩৬-বর্তমান) একাধারে চিত্র সমালোচক, লেখক এবং শিক্ষাবিদ। ছোটগল্পে অবদানের জন্য তিনি ১৯৬৯ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পান। এছাড়া শিক্ষা ও গবেষণায় অবদান স্বরূপ ২০০৯ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে একুশে পদকে ভূষিত করে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এবং পরবর্তীতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ উপাচার্য পদে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বাংলা সাহিত্যে একাধারে গল্প, কবিতা, উপন্যাস, অনুবাদ এবং গবেষণা কর্মে অবদান রেখেছেন।]

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s